Ticker

10/recent/ticker-posts

অদৃশ্য চক্রের হাতে বন্দি প্রকৌশল পেশা

 

মানবসম্পদ

অদৃশ্য চক্রের হাতে বন্দি প্রকৌশল পেশা

অদৃশ্য চক্রের হাতে বন্দি প্রকৌশল পেশা

মাহবুবুর রাজ্জাক

মাহবুবুর রাজ্জাক

 প্রকাশ: ১৯ জুলাই ২০২৫ 

যে কারণেই হোক এই দেশে মেধাবীদের একটি বড় অংশের স্বপ্ন থাকে প্রকৌশলী হয়ে দেশের সেবা করা। বাস্তবে দেশের সেবা দূরের কথা, কর্মক্ষেত্রে নিজেই অপাঙ্‌ক্তেয় হয়ে পড়ে। ক্লাসরুমে যা শিখে এসেছে, চাইলেই তা প্রয়োগ করা যায় না। এ দেশে প্রকৌশল পেশা যেন এক অদৃশ্য চক্রের হাতে বন্দি। তাই বাংলাদেশের কারিগরি প্রতিষ্ঠানগুলোতে প্রকৌশলচর্চার সংস্কৃতি গড়ে ওঠেনি। 
প্রকৌশলচর্চা নয়, কখনও কখনও ক্রয়চর্চাতেই যেন সংশ্লিষ্টদের আগ্রহ বেশি। এই চর্চায় ওপর মহলের আশীর্বাদও বেশি।

একবার পানি উন্নয়ন বোর্ডের একটি বড় সেচ প্রকল্পের পাম্প হাউসের কারিগরি পরীক্ষা-নিরীক্ষার সুযোগ হয়েছিল। যে কোনো যন্ত্রপাতি দীর্ঘদিন সচল রাখতে চাইলে ম্যানুফ্যাকচারিং কোম্পানির দেওয়া শিডিউল অনুযায়ী তা রক্ষণাবেক্ষণ করতে হয়। কিন্তু দেখা গেল, পাম্প কোম্পানির পরামর্শ মানা হচ্ছে না। তার জন্য নাকি বাজেট নেই, প্রশিক্ষিত লোকবল নেই। আমাদের কাছে মনে হয়েছিল, কয়েকটি পাম্প ওভারহলিং করে পুনরায় ব্যবহার করা সম্ভব। কিন্তু তারা বেশ জোর দিয়ে চাচ্ছিলেন সবক’টি ফেলে দিয়ে নতুন পাম্প কিনতে। প্রকল্পটি সুপারভিশনের জন্য প্রকৌশলীদের একটি দল আছে। কিন্তু পাম্প হাউসের নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ তারা করে না। এই কাজে তাদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থাও করা হয় না। 

কারিগরি যন্ত্রাদি কেনাকাটার নামে বিদেশ ভ্রমণের সুযোগ আছে। এই সুযোগের সদ্ব্যবহার করে প্রকৌশলীরা নতুন কোনো কাজে অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করে থাকে অথবা আমদানি করা পণ্যের গুণগত মান নিশ্চিত করে থাকে। কিন্তু প্রায়ই দেখা যায়, যে সরকারি টিম বিদেশে যায় তাতে সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীদের স্থান হয় না। 
একবার বাংলাদেশ রেলওয়ের এক প্রকল্পের পরিচালককে দেখলাম বেশ চিন্তামগ্ন। তাঁর প্রকল্পের আওতায় ১২ জনের একটি ঢাউস টিমের বিদেশ যাত্রার বন্দোবস্ত প্রায় চূড়ান্ত। ফাইল এসে আটকে আছে মন্ত্রীর টেবিলে। যে করেই হোক মন্ত্রীর এক রাজনৈতিক সাগরেদকে টিমে নিতে হবে। কথা প্রসঙ্গে জানলাম, ফাইল যেই যেই সরকারি দপ্তরে গিয়েছে, তাদের সবাইকে ম্যানেজ করতে গিয়েই টিমের সদস্য সংখ্যা ১২ জনে দাঁড়িয়েছে, যাদের অনেকেরই এ কাজে কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই। ফলে প্রকল্পসংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীদের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা সঞ্চয়ের সুযোগটি ছেড়ে দিতে হয়েছে এবং প্রকল্পটি ক্ষতিগ্রস্ত। সফলভাবে প্রকল্প বাস্তবায়ন ও রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করতে চাইলে প্রকৌশলীদের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা সঞ্চয়ের সুযোগে বাগড়া দেওয়া পরিহার করতে হবে।

নতুন প্রকৌশলীরা প্রথম যখন কাজে যোগ দেয়, তাদের মাথায় অনেক কিছু করার স্বপ্ন ঘোরাঘুরি করে। তাদের উৎসাহিত করে কাজে লাগাতে পারলে অনেক কারিগরি সমস্যাই হয়তো অভ্যন্তরীণভাবে সমাধা করা সম্ভব হতো। কিন্তু আমাদের দেশের কর্মক্ষেত্রের পরিবেশ নবীনদের উৎসাহিত করার পরিবর্তে প্রায়ই নিরুৎসাহিত করে থাকে। আমার এক ছাত্র পাস করার পরপর একটি কারখানায় চাকরি নিয়েছিল। কাজে যোগ দিয়ে সে দেখতে পেল কিছু রক্ষণাবেক্ষণ কাজ, যা বাইরে থেকে করিয়ে আনা হতো তা সহজেই নিজেরা করা সম্ভব। সে তা করেও দেখাল। খরচও পড়ল কম। কিন্তু বাদ সাধলেন তার প্রবীণ সহকর্মীরা। কাজটি বাইরে থেকে করিয়ে আনা হলে সেই সহকর্মীদের পকেটে কিছু টাকাপয়সা ঢুকত। তারা মনে করলেন, নতুন এই ছেলেকে কাজ করার সুযোগ দিলে তাদের আয়-রোজগারে ভাটা পড়বে। কাজেই তারা দল বেঁধে এমনভাবে নতুন ছেলেটির পেছনে লাগলেন যাতে সে বিরক্ত হয়ে চাকরি ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়। কারিগরি সমস্যা সমাধানে নতুন প্রকৌশলীদের থেকেও ভালো উদ্ভাবনীমূলক ধারণা পাওয়া সম্ভব। তাই নতুনদের জন্য উদ্ভাবনী কাজে প্রেরণাদায়ক কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। 

এই দেশে প্রায় ৬০ বছর ধরে বিদেশিদের দিয়ে বিভিন্ন সরকারি মেগা প্রকল্পের মাধ্যমে অবকাঠামোগত উন্নয়ন হচ্ছে। এসব প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় দেশীয় প্রকৌশলীদের যথাযথ পদমর্যাদায় যুক্ত করা হয় না। ফলে বিদ্যুৎকেন্দ্র হোক, সার কারখানা হোক অথবা অন্য যে কোনো কলকারখানা, দেশে গণ্ডায় গণ্ডায় থাকার পরও স্থানীয় প্রযুক্তিবিদদের দিয়ে নিজেরাই একটি তৈরির সাহস আমাদের হয় না। আমরা প্রযুক্তি কিনছি, কিন্তু সেই প্রযুক্তিতে নিজেদের দক্ষ করে তুলতে পারছি না। দেশের প্রকৃত উন্নয়নের লক্ষ্যে এখন থেকে পদ্মা সেতু প্রকল্পের মতো সব বিদেশি মেগা প্রকল্পে দেশীয় প্রকৌশলীদের নিয়োগ নিশ্চিত করে প্রযুক্তিগত দক্ষতা অর্জনের দিকে মনোযোগ দিতে হবে।  

প্রযুক্তি নিয়ত পরিবর্তনশীল। এই পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে চলতে চাইলে কার্যকর ইন্ডাস্ট্রি– একাডেমিয়া যোগাযোগ স্থাপন করতে হবে। এতে একদিকে প্রকৌশল শিক্ষার্থীদের পাঠক্রম যুগোপযোগী করা সম্ভব হবে। অন্যদিকে প্রকৌশলীরা বাস্তবে যেসব প্রযুক্তিগত সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা সে সম্পর্কে সহজে অবহিত হতে পারবেন। ফলে নিজেদেরই প্রযুক্তিগত সমস্যা সমাধানের পথ তৈরি হবে। বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড, পানি উন্নয়ন বোর্ড, রেলওয়ে, বিসিআইসি ইত্যাদি প্রতিষ্ঠানে ছোট করে হলেও একটি গবেষণা সেল থাকা উচিত। এই গবেষণা সেলের কাজ হবে সেই প্রতিষ্ঠানে প্রযুক্তিগত সমস্যাগুলো চিহ্নিত করা এবং বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষকদের কাছে সমস্যাগুলো উপস্থাপন করা।
কোনো কারিগরি প্রতিষ্ঠানে যদি নিজস্ব গবেষণা সেল, সেই সঙ্গে একটি গবেষণাগার থাকে তাহলে সেই প্রতিষ্ঠানে প্রকৌশলচর্চার মান উন্নত হতে বাধ্য। এতে যেসব পণ্য ক্রয় করা হবে তার মান নিজেরা যাচাই করে নেওয়া সম্ভব হবে। একই সঙ্গে বিভিন্ন যন্ত্রপাতি এবং অবকাঠামোর অবস্থা কারিগরি মান অনুযায়ী নিয়মিত তদারক করা সম্ভব হবে। সঠিক তদারকি আর যত্নের অভাবেই আমাদের দেশে শত শত কোটি টাকার সম্পদ বিনষ্ট হয়। যেই প্রতিষ্ঠানে নিজস্ব গবেষণা সেল নেই, সেই প্রতিষ্ঠানে সঠিক প্রকৌশলচর্চা সম্ভব নয়।       

ড. মাহবুবুর রাজ্জাক: অধ্যাপক,
যন্ত্রকৌশল বিভাগ, বুয়েট
mmrazzaque@me.buet.ac.bd

Post a Comment

0 Comments

সরকারের নজর নেই, অব্যবস্থাপনায় ব্যয় বাড়ছে শিক্ষা খাতে